নিজেদের মেয়াদকালে ছয় হাজারের বেশি ভোট করেছে নুরুল হুদা কমিশন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিতর্কের মুখে পড়তে হয় একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে। চলতি বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি মেয়াদ শেষ করে বিদায় নেওয়ার পর এতদিন চুপচাপ থাকলেও অবশেষে মুখ খুললেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার। বললেন, ২০১৮ সালের ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ নির্বাচন নিয়ে করার কিছুই ছিল না তাদের। এর দায় দিয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে।
শুধু তাই নয়, দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনী ধারা ফিরতে দুইশ বছর লাগবে বলেও মনে করেন আলোচিত এই সিইসি।
দায়িত্ব থেকে বিদায় নেওয়ার ৬ মাসেরও বেশি সময় পর বেসরকারি একটি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে এসব কথা বলেন তিনি।
সাক্ষাৎকারে নুরুল হুদা বলেছেন, ২০১৮ সালের ভোট নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কিছুই করার ছিল না। সরকার নয় বরং সরকারি দলের কারণেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল সেই নির্বাচন।
ইংল্যান্ডে ১৮৮৩ সাল থেকে ২০০ বছর লেগেছিল নির্বাচন গ্রহণযোগ্য বা ফেয়ার করার পেছনে। আমার যদি কনভেনশনাল নিয়মে যাই তাহলে আমাদের ২০০ বছর সময় লাগবে।
নুরুল হুদা, সাবেক সিইসি
২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নেওয়া নুরুল হুদা কমিশনের মেয়াদ শেষ হয় গত ১৪ ফেব্রুয়ারি। নিজেদের মেয়াদের পাঁচ বছরে হুদা কমিশন জাতীয় সংসদ, জাতীয় সংসদের উপনির্বাচন এবং সব স্থানীয় সরকার পরিষদের সাধারণ ও উপনির্বাচনসহ মোট ৬ হাজার ৬৯০টি নির্বাচন পরিচালনা করেছে। জাতীয় সংসদসহ তৃণমূলের নির্বাচনে সহিংসতা, কারচুপিসহ নানা অভিযোগও ছিল ওই সময়ে।
ওইসব নির্বাচন নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও তখনও অনেকটা নির্বিকার ছিল হুদা কমিশন। তাদের মধ্যে ব্যতিক্রম ছিলেন প্রয়াত নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। ভোটে সহিংসতা, পক্ষপাতিত্ব, কারচুপির প্রতিবাদ করেছেন শেষ পর্যন্ত। কিন্তু সাবেক সিইসি নুরুল হুদা নিজেকে অনেকটা সফল বলেই দাবি করে আসছিলেন।
গত ১৪ ফেব্রুয়ারি বিদায় বেলায় নুরুল হুদার ভাষ্য ছিল, ‘দেখতে দেখতে নির্বাচন কমিশনে আমাদের পাঁচ বছর কেটে গেল। আজ আমাদের শেষ কর্মদিবস। দীর্ঘ পাঁচ বছর আমরা নির্বাচন কমিশনে ব্যস্ততম সময় পার করেছি। অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি এবং তা সফলভাবে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছি। দেশের সংবিধান প্রদত্ত দায়িত্বসহ যাবতীয় দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছি।’
তবে টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অনেকটা ভিন্ন সুরে কথা বলেন কে এম নুরুল হুদা। বলেন, যারা সরকারের দলে থাকে নির্বাচনে তাদের প্রভাব থাকতে পারে, তাদের এইসব সুযোগ নেওয়ার আছে।
ইসির সীমাবদ্ধতার প্রসঙ্গে সাবেক সিইসি বলেন, এই ধরনের অভিযোগ যখন আছে তাহলে কোথাও কোথাও এই ধরনের সত্যতা থাকতে পারে। আমরা জানি না সঠিক কিনা। যদি হয়ে থাকে সেটি খারাপ। কেউ রিপোর্ট না করলে নির্বাচন কমিশনদের ওই পর্যন্ত গিয়ে দেখভাল করার সুযোগ নাই।
নির্বাচনে বড় বড় দলগুলো অংশগ্রহণ করানো একটা বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তাহলে ভালো হবে।
তাহলে বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচনী ধারা কবে ফিরবে এমন প্রশ্নের জবাবে হতাশার সুরে সাবেক সাবেক এই সিইসি বলেন, সময় লাগবে আরও দু’শো বছর। বলেন, ইংল্যান্ডে ১৮৮৩ সাল থেকে ২০০ বছর লেগেছিল নির্বাচন গ্রহণযোগ্য বা ফেয়ার করার পেছনে। আমার যদি কনভেনশনাল নিয়মে যাই তাহলে আমাদের ২০০ বছর সময় লাগবে।
নিরপেক্ষ কিংবা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় সমাধান দেখেন কিনা- এমন প্রশ্নে তার সরাসরি জবাব তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসার পক্ষে আমি না। আমি এটার বিপক্ষে। ভুল যাই হোক না কেন এই কনভেনশনাল নিয়মের মধ্যে হতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কনসেপ্ট একটা খারাপ কনসেপ্ট।
আসছে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে নুরুল হুদা বলেন, গত নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলেও আগামী ভোটে তাদের আনাটাই বর্তমান কমিশনের বড় চ্যালেঞ্জ।
সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, নির্বাচনে বড় বড় দলগুলো অংশগ্রহণ করানো একটা বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তাহলে ভালো হবে।
এদিকে বিএনপিসহ বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল যখন বিরোধিতা করছে তখন নির্বাচনী এই সংস্কৃতির পরিবর্তন আনতে ইভিএমের ওপরই আস্থার কথা জানালেন নুরুল হুদা।
পি এস / এন আই


