
আগামী সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আন্দোলনে থাকা বিএনপি এবার জোরেশোরে মাঠে নামার পরিকল্পনা নিয়েছে। সে লক্ষ্যে আগামী বুধবার (১২ জুলাই) সরকারবিরোধী একদফা আন্দোলনের চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়ার কথা বলছেন দলটির নেতারা। ওইদিন রাজধানীর নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করে নতুন কর্মসূচি দেবে দলটি। এই সমাবেশকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের শোডাউন করার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
ইতিমধ্যে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক সেরেছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অন্যদিকে মূল দলের বাইরে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সর্বোচ্চ উপস্থিতির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বড় দায়িত্বে থাকা ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের নেতারা যৌথসভা করে প্রতিটি ওয়ার্ড ও থানার নেতাদের সমাবেশে সর্বোচ্চ উপস্থিতির কড়া নির্দেশনা দিয়েছেন। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করারও তাগিদ দেওয়া হয়েছে দলের পক্ষ থেকে।
সমাবেশে ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো থেকে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী অংশ নেবেন- এমন সিদ্ধান্তও রয়েছে বিএনপিতে। ইতিমধ্যে সেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে হাইকমান্ডের পক্ষ থেকে।
এদিকে গত শনিবার সমাবেশের জন্য ডিএমপির কাছে অনুমতি চাওয়া হয়েছে বিএনপির পক্ষ থেকে। চিঠি পর্যালোচনা করে অনুমতির বিষয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে ডিএমপি।
যদিও একইদিন ঢাকায় আওয়ামী লীগ সমাবেশ ডাকায় অনুমতি কখন পাওয়া যাবে তা নিয়ে সংশয় আছে বিএনপি নেতাদের মধ্যে।
সমাবেশে ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো থেকে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী অংশ নেবেন- এমন সিদ্ধান্তও রয়েছে বিএনপিতে। ইতিমধ্যে সেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে হাইকমান্ডের পক্ষ থেকে।
সমাবেশ কেন্দ্র করে সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য সচিব সদস্য আমিনুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, ১২ তারিখ বড় আকারে সমাবেশ হবে। সর্বোচ্চ উপস্থিতি হবে। এটা সফল করার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী নেওয়া হচ্ছে। মহানগর উত্তরের বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের সেভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যাতে সব ইউনিট থেকে সর্বোচ্চ উপস্থিতি নিশ্চিত করে।
অন্যদিকে সিলেটে তারুণ্যের সমাবেশে যোগ দিয়ে রোববার (৯ জুলাই) বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও ঢাকায় বড় সমাবেশের ইঙ্গিত দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, এই সরকারকে বিদায় দেওয়া ছাড়া কোনো পথ নেই। আগামী ১২ তারিখ ঢাকায় একটা সমাবেশ হবে। সেই সমাবেশে নতুন ঘোষণা আসবে। সেই ঘোষণার মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নতুন যাত্রা শুরু হবে। সেই যাত্রায় তরুণদের জেগে উঠতে হবে। পুরো দেশের মানুষকে জাগিয়ে তুলতে হবে।
একদফার কর্মসূচি ঘিরে যা করছে বিএনপি
বিএনপির পক্ষ থেকে গত বছরের ১০ ডিসেম্বর রাজধানীর গোলাপবাগ মাঠে ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশ থেকে সরকারের পদত্যাগ, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ ১০ দফা দাবিতে যুগপৎ আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এরপর ২৪ ডিসেম্বর থেকে যুগপৎ আন্দোলন কর্মসূচি শুরু করে বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো। তবে সাবেক জোটসঙ্গী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে যুগপৎ কর্মসূচিতে দেখা যায়নি। যদিও তারা বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকতে পারেন এমনটা আলোচনা আছে।
এদিকে বিএনপি এমন এক সময়ে সমাবেশ করে সরকার পতনের কর্মসূচি ঘোষণা করতে যাচ্ছে যখন দেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন-বিষয়ক তথ্যানুসন্ধানী মিশনের ছয় সদস্য ঢাকায় এসেছেন। তাদের সঙ্গে বিএনপির প্রতিনিধি দলেরও বৈঠকের কথা রয়েছে।
অনেকদিন পরে হলেও সমাবেশের মধ্য দিয়ে আমরা প্রমাণ করতে চাই বিএনপির আন্দোলনের শক্তি বাড়ছে। মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ছে। সেভাবেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সবাইকে।
—আবদুস সালাম আজাদ, ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক
বিএনপির নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে, ইইউ মিশনের সঙ্গে বৈঠকের আগেই সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনের ঘোষণা দিয়ে ইইউ প্রতিনিধি দলের কাছে বিএনপি বার্তা দিতে চায়, সরকার পতনের আন্দোলন চূড়ান্ত ধাপে তারা নেমেছে।
bnp
এছাড়া গত শনিবার (৮ জুলাই) সমাবেশ সফল করতে নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে (ভার্চুয়ালি) অনুষ্ঠিত প্রায় এক ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার সভা হয়। সেখানে বড় ধরনের জমায়েতের নির্দেশ দেওয়া হয়।
নয়াপল্টনের ওই বৈঠকের পর রাতে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাজধানীর গুলশানে চেয়ারপারসনের বাসায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এরপর রাতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে দলের স্থায়ী কমিটির ভার্চুয়াল সভা হয়। মহাসচিব ছাড়াও স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বৈঠকে অংশ নেন।
এদিকে সমাবেশ সফল করতে রোববার বিকেলে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ যৌথসভা করেছে। সোমবার ঢাকা জেলা বিএনপিও থানা ও পৌর কমিটির বৈঠক করবে।
দলের নির্দেশনা পাওয়ার পর ঢাকা বিভাগের অন্যান্য জেলা ও মহানগর কমিটিও কাজ করছে বলে জানান ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদ।
ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, অনেকদিন পরে হলেও সমাবেশের মধ্য দিয়ে আমরা প্রমাণ করতে চাই বিএনপির আন্দোলনের শক্তি বাড়ছে। মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ছে। সেভাবেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সবাইকে।
সমাবেশে সর্বোচ্চ সংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতির পাশাপাশি সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরা চাই সরকারের প্রতি যে জনগণের অনাস্থা সেটা প্রমাণ হবে ১২ জুলাই।
—সাইদুর রহমান মিন্টু, দফতর সম্পাদক, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি
এদিকে বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের উপস্থিতিতে সোমবার (১০ জুলাই) বৈঠক ডেকেছেন। যাতে ঢাকা বিভাগের প্রতিটি জেলা মহানগর, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ সুপার ফাইভ নেতাদের অংশগ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলা কলেজ শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন বিপ্লব ঢাকা মেইলকে বলেন, সমাবেশে সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে। এখানে কোনো ত্রুটি করা যাবে না। আমরা সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছি। ঢাকায় এবং বাইরে যারা আছেন তাদেরও সমাবেশে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কাজ করছি। বাকিটা সোমবারের বৈঠকের পর বোঝা যাবে।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির দফতর সম্পাদক সাইদুর রহমান মিন্টু ঢাকা মেইলকে বলেন, সমাবেশে সর্বোচ্চ সংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতির পাশাপাশি সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরা চাই সরকারের প্রতি যে জনগণের অনাস্থা সেটা প্রমাণ হবে ১২ জুলাই। যৌথসভায় থানা ও ওয়ার্ডের দায়িত্বশীল নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সবাই নির্দেশনার আলোকে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আশা করি একটি সফল সমাবেশ উপহার দেওয়া সম্ভব হবে।
চিঠির অনুলিপি আমি পেয়েছি। তবে একই দিন আওয়ামী লীগও সমাবেশ করার অনুমতি চেয়েছে। আমরা বিষয়টি পর্যালোচনার পর সিদ্ধান্ত নেব।
—হায়াতুল ইসলাম, মতিঝিল বিভাগের ডিসি, ডিএমপি
অনুমতি নিয়ে অপেক্ষায় রেখেছে ডিএমপি
অনুমতি নিয়ে বিএনপিকে অনেকটা অপেক্ষায় রেখেছে ডিএমপি। বিএনপি নেতারা আশা করছেন তাদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অনুমতি দিতে পুলিশ গড়িমসি করবে না। তারপরও সবশেষ পরিস্থিতি জানতে বিএনপির একটি প্রতিনিধি দলের ডিএমপিতে যাওয়ার কথা রয়েছে।
অনুমতির বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের ডিসি হায়াতুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, চিঠির অনুলিপি আমি পেয়েছি। তবে একই দিন আওয়ামী লীগও সমাবেশ করার অনুমতি চেয়েছে। আমরা বিষয়টি পর্যালোচনার পর সিদ্ধান্ত নেব। তবে ঊর্ধ্বতন থেকে এখনও কিছু জানানো হয়নি। বিষয়টি ভেবে দেখে অনুমতি দেওয়া হবে।
তবে ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক ইতোমধ্যে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তারা বিএনপির পক্ষ থেকে পাঠানো চিঠি পেয়েছেন। সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হবে কি না তা পর্যালোচনা করে দেখবেন।


