সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের আওতাধীন পাতকোষ্টা এলাকার বেশো খালে মাছ ও কাঁকড়া ধরতে গিয়ে আমিনুর রহমান (৪৫) নামের এক জেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার ঘটনায় পাল্টাপাল্টি মামলা দায়ের হয়েছে। নিহতের পরিবার বন বিভাগের দুই কর্মকর্তাসহ অজ্ঞাতনামা ৯ থেকে ১০ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছে। অন্যদিকে বনরক্ষীদের ওপর হামলার অভিযোগে বন বিভাগের পক্ষ থেকেও একটি মামলা করা হয়েছে। তবে ওই মামলায় কোনো আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি।
নিহত আমিনুর রহমান সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সোরা গ্রামের বাসিন্দা। বুধবার রাতে তাঁর ভাতিজা অলিউল্যাহ বাদী হয়ে কয়রা থানায় মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় বন বিভাগের নলিয়ান ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা মোবারক হোসেন, পশ্চিম বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক শামীম রেজাসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে কয়রা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহ আলম বলেন, ঘটনাস্থল কয়রা থানা এলাকায় হওয়ায় নিহত জেলের স্বজনরা সেখানে মামলা করেছেন। পাশাপাশি বন বিভাগের পক্ষ থেকেও একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। বন বিভাগের শরবতখালী টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোক্তাদির রহমান অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলাটি করেন।
নিহত জেলের ভাতিজার করা মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, আমিনুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে বৈধ পাস নিয়ে সুন্দরবনের নদী-খালে মাছ ও কাঁকড়া ধরতেন। বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও তাঁদের সহযোগীরা জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা আদায় করতেন বলেও অভিযোগ করা হয়। প্রায় ১৫ দিন আগে আমিনুর রহমানের কাছ থেকেও টাকা নেওয়া হয় এবং এ নিয়ে বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর বাগ্বিতণ্ডা হয়। তখন তাঁকে সুযোগ পেলে দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়, গত ১৩ মে আমিনুর রহমান তাঁর ভাতিজা অলিউল্যাহসহ কয়েকজনকে নিয়ে সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধরতে যান। ১৮ মে সকাল ৭টার দিকে কয়রার আওতাধীন সুন্দরবনের পাতকোষ্টা এলাকার বেশো খালে মাছ ধরার সময় বন বিভাগের একটি টহল দল সেখানে পৌঁছায়। এ সময় নলিয়ান ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা মোবারক হোসেন আমিনুরের কাছে টাকা চান বলে অভিযোগ করা হয়। তিনি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে গালিগালাজ ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে অভিযুক্তদের একজন রাইফেল দিয়ে গুলি করলে সেটি আমিনুর রহমানের শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যায়। এতে তিনি নৌকার ওপর লুটিয়ে পড়েন এবং কিছুক্ষণ পর মারা যান বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বন বিভাগের নলিয়ান ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা মোবারক হোসেন। তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে তিনি উপস্থিত ছিলেন না এবং তাঁর বিরুদ্ধে গুলি করার অভিযোগও সঠিক নয়। তাঁর দাবি, ঘটনাস্থলটি ছিল সুন্দরবনের প্রবেশ নিষিদ্ধ অভয়ারণ্য এলাকা, যেখানে বন বিভাগের স্মার্ট টহল টিম দায়িত্ব পালন করছিল। কয়েক দিন আগে ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১১টি নৌকা জব্দ করা হয়েছিল, যার অধিকাংশই শ্যামনগরের সোরা গ্রামের বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর অভিযোগ, ওই এলাকার কিছু লোক সংঘবদ্ধভাবে নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ ও বনরক্ষীদের ওপর চড়াও হওয়ার ঘটনা আগেও ঘটিয়েছে।
বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২২ মে পর্যন্ত সুন্দরবনের পশ্চিম বন বিভাগের আওতায় একটি ‘স্মার্ট টহল টিম’ গঠন করা হয়। খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. শরিফুল ইসলামের সই করা আদেশে দাকোপ ও কয়রা উপজেলার আওতাধীন বনাঞ্চলে টহলের নির্দেশ দেওয়া হয়। দলের নেতৃত্বে ছিলেন শরবতখালী টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মোক্তাদির রহমান। সহকারী টিম লিডার ছিলেন কালাবগী ফরেস্ট স্টেশনের ফরেস্টার মো. আতিয়ার রহমান। এছাড়া কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের ফরেস্টার মো. আছাদুজ্জামানসহ মোট আটজন সদস্য ওই টহল দলে ছিলেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বন বিভাগের এক সদস্য জানান, প্রবেশ নিষিদ্ধ পাতকোষ্টা এলাকার ঝালিয়া শতমুখী খালে জেলেদের নৌকা দেখতে পেয়ে টহল দল সেখানে যায়। এ সময় জেলেরা দা, কুড়াল ও বৈঠা নিয়ে বনরক্ষীদের দিকে তেড়ে আসেন। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে এক বনরক্ষীর হাতে থাকা রাইফেল ভেঙে যায় এবং আরেকজনের অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়। পরে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে একটি গুলি বের হয়ে যায় এবং সেটি আমিনুর রহমানের শরীরে লাগে বলে দাবি করেন তিনি।
স্মার্ট টহল টিমের নেতা মোক্তাদির রহমান বলেন, বনরক্ষীদের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে আসামিদের পরিচয় প্রকাশ করা যাচ্ছে না।
এদিকে জেলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে গত সোমবার সাতক্ষীরা রেঞ্জ কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্র জানায়, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্যামনগরের গাবুরা এলাকার ডুমুরিয়া, দৃষ্টিনন্দন ও চাঁদনীমুখা পয়েন্টে লোকজন জড়ো হতে থাকেন। পরে বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ১০ থেকে ১২টি ট্রলারে করে পাঁচ শতাধিক গ্রামবাসী নিহত জেলের লাশ নিয়ে নীলডুমুর খেয়াঘাটে পৌঁছান। এ সময় দাতিনাখালী ও বুড়িগোয়ালিনী এলাকা থেকে আরও কয়েক শ মানুষ তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন।
একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ লোকজন সাতক্ষীরা রেঞ্জ কার্যালয়ের সামনে লাশ রেখে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে তাঁরা রেঞ্জ কার্যালয়ের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়েন। হামলাকারীরা সিসিটিভি ক্যামেরা, জানালা, গ্রিল, ফটকসহ বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর করেন। বন বিভাগের দাবি, হামলাকারীরা রান্নাঘরে ঢুকে প্লেট, পিরিচ, গামলাসহ বিভিন্ন সামগ্রী ভাঙচুরের পাশাপাশি চাল-ডালসহ কিছু খাদ্যসামগ্রীও নিয়ে যান।
সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মশিউর রহমান বলেন, হামলাকারীরা যাকে সামনে পেয়েছে তাকেই মারধর করেছে। এতে পাঁচজন বনকর্মী আহত হয়েছেন। তিনি দাবি করেন, জেলের মৃত্যুর ঘটনাটি খুলনা রেঞ্জ এলাকায় হলেও হামলা চালানো হয়েছে সাতক্ষীরা রেঞ্জ কার্যালয়ে। তাঁর ভাষ্য, পুরো ঘটনার পেছনে বড় ধরনের ষড়যন্ত্র থাকতে পারে।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, বনরক্ষীদের সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনায় ইতোমধ্যে মামলা হয়েছে। পাশাপাশি সাতক্ষীরা রেঞ্জ কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় আরেকটি মামলার প্রস্তুতি চলছে। তিনি জানান, ক্ষয়ক্ষতির তালিকা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জেলে নিহতের ঘটনাটি তদন্তে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একটি কমিটিতে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং অন্যটিতে খুলনা জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধিরা রয়েছেন।
সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সংরক্ষণ আন্দোলন কমিটির আহ্বায়ক শুভ্র শচীন বলেন, উপকূলে জীবিকার সংকট এবং সুন্দরবনের নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশকে কেন্দ্র করে বন বিভাগ ও জেলেদের মধ্যে তৈরি হওয়া অবিশ্বাসের সম্পর্ক পরিস্থিতিকে দিন দিন জটিল করে তুলছে। তিনি জেলে নিহতের ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের দাবি জানান, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাণহানির ঘটনা আর না ঘটে। একই সঙ্গে বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিও জানান তিনি।


