
অর্থ লোপাটের নানা অনিয়মের তথ্য মিলেছে চট্টগ্রাম বন্দরে। বন্দর কর্তৃপক্ষের ১৭ বিভাগের সবকটিতে এই অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে। এরমধ্যে ২৬টি আর্থিক অনিয়ম গুরুতর, যার মোট পরিমাণ ২৫৮ কোটি ৫১ হাজার ৮৫৫ টাকা।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) পরিবহন অডিট অধিদফতরের সর্বশেষ কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্টে এ তথ্য উঠে এসেছে। সোমবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং চট্টগ্রামের বন্দর-পতেঙ্গা আসনের সংসদ সদস্য এমএ লতিফ এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, অডিট রিপোর্টের তথ্য নিয়ে স্থায়ী কমিটির সাম্প্রতিক বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে ২৫৮ কোটি ৫১ হাজার ৮৫৫ টাকার অডিট আপত্তির বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির সুপারিশ করা হয়েছে। নিরীক্ষাকালে পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অনিয়মের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগের বক্তব্য চেয়ে একাধিকবার জিজ্ঞাসাপত্র ইস্যু করেছেন। সংশ্লিষ্টরা ১১টি অনিয়মের জবাব দিয়েছেন।
অডিট রিপোর্টের তথ্য মতে, টাগবোট সরবরাহের জন্য চট্টগ্রামের নিউ ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপবিল্ডার্স লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করেছিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে এটি সরবরাহ করতে পারেনি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। নিয়মানুযায়ী চুক্তি বাতিলসহ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করার কথা। কিন্তু তা না করে উল্টো ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে বিল পরিশোধ করা হয়েছে। ওই বিলের পরিমাণ ২৩ কোটি ৮ লাখ ৮৩ হাজার ৩৪৩ টাকা।
একইভাবে চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেডের সঙ্গে এমটি কান্ডারী-১ জাহাজের ডকিং ও মেরামতের চুক্তি করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। যে তারিখে চুক্তি সে তারিখে কার্যাদেশও দেওয়া হয়। কিন্তু কাজ শেষ করতে বেঁধে দেওয়া হয়নি কোনো সময়। এ সুযোগে মাত্র তিনদিনেই কাজ শেষ হয়েছে দেখিয়ে ১২ কোটি ৬৭ লাখ ৬১ হাজার ৬০৭ টাকার চূড়ান্ত বিল দাখিল করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেড।
এমনকি ১৩ দিনের মাথায় বিল পাস করে দেয় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মেরিন প্রকৌশল বিভাগ। অন্যদিকে মেরামত কাজে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় জাহাজটির ভারপ্রাপ্ত নাবিক রহিম খান মাত্র ২১ দিন পর ফের মেরামতের জন্য আবেদন করেন। অর্থাৎ জাহাজটি আগের বার মেরামতই করা হয়নি।
অর্থ লোপাটে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নানা অনিয়ম ধরা পড়ে করোনাকালে স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী কেনাকাটায়ও। এতে ৫৫ লাখ ৭৭ হাজার ৫০০ টাকার অনিয়ম হয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। এসব সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে, এন-৯৫ সেফটি মাস্ক, সার্জিক্যাল হ্যান্ড গ্লাভস, অ্যাপ্রোন, প্রটেকটিভ গগলস, ডাক্তারদের ব্যবহারের জন্য পিপিই ইত্যাদি। এজন্য মেসার্স জনতা এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে দুই দফায় ৮৭ লাখ ৭০ হাজার টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে কোটেশনও নেওয়া হয়নি। নিয়ম লঙ্ঘন করেই যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহের জন্য মনোনীত করা হয়।
বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিকিৎসা সেবার জন্য হাসপাতাল ও আলাদা চিকিৎসা বিভাগ এবং মালপত্র সরবরাহের জন্য কেন্দ্রীয় ভান্ডার বিভাগ রয়েছে। এরপরও হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ কৌশলে পছন্দের ঠিকাদারের মাধ্যমে অস্বাভাবিক বাড়তি দরে কিনেছে এসব স্বাস্থ্যসামগ্রী। এছাড়া কোনো চাহিদাপত্র ছিল না। কোন কোন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুকূলে এগুলো ইস্যু করা হয়েছে এর কোনো প্রমাণপত্র নেই।
এদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষের ভান্ডার বিভাগ সমঝোতার ভিত্তিতে সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে ঠিকাদার নির্বাচন করেছে। এতে ১ কোটি ২০ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৯ টাকার অনিয়ম হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ হাসপাতালের নবনির্মিত ভবনের জন্য পঞ্চম পর্যায়ে ৯ ধরনের আসবাব কেনার জন্য এই সীমিত দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্র আহ্বানের তারিখ ২৬.১২.২০১৯। অথচ দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর পে-অর্ডার আগের তারিখে ইস্যু করা। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত জামানতের টাকার পে-অর্ডার করা হয়েছে। কাজ পাওয়া ভাগ্যবান প্রতিষ্ঠানটি হলো মেসার্স প্রভা এন্টারপ্রাইজ।
সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে ১৬টি চুক্তিপত্র ও আনুষঙ্গিক নথিপত্র যাচাইয়ে দেখা যায়, দরপত্র সিডিউলগুলোর অধিকাংশ একই হাতে পূরণ করা হয়েছে। দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো একই তারিখের পে-অর্ডার এবং পাশাপাশি ক্রমিকের পে-অর্ডার দিয়েছে। প্রায় প্রতিটি দরপত্রে সমসংখ্যক চারটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। নাভানা, অটবি, আক্তার ও হাতিল ব্র্যান্ডের আসবাব কেনার জন্য সীমিত দরপত্র পদ্ধতি প্রয়োগ করা হলেও এসব প্রতিষ্ঠান থেকে কিছুই কেনা হয়নি। নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেওয়ার বিষয়টি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই নির্ধারণ করা হয়েছে বলে প্রমাণ মিলেছে।
এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার নামে বড় অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত কিছু প্রশিক্ষণার্থীর ট্রেনিং ভাতা ও প্রশিক্ষকদের সম্মানী ভাতা বাবদ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বরাদ্দ দেয় ২৮ লাখ ৮০ হাজার ২০৮ টাকা।
কিন্তু পুরো টাকা ব্যক্তিগত নামে পে-অর্ডারের মাধ্যমে উত্তোলন করেছেন ইনস্টিটিউটের ম্যানেজার (ট্রেনিং) হালিমা বেগম ও সিনিয়র ট্রেনিং অফিসার আবদুল হান্নান। প্রশিক্ষণার্থী বা প্রশিক্ষক কাউকে কোনো টাকা প্রদান বা গ্রহণের কোনো প্রমাণপত্র নেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। ইনস্টিটিউটের নথি, বিল ভাউচার এবং অন্যান্য রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় এসব টাকা আত্মসাতের প্রমাণ মিলেছে। আর প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও ভুয়া বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
এছাড়া অস্বাভাবিক দরে ঠিকাদারের মাধ্যমে সিসি ব্লক ও আরসিসি প্রিকাস্ট পাইল পরিবহন কাজ সম্পাদন, ঠিকাদারের প্রস্তাবিত দর অপেক্ষা অধিক দরে চুক্তি সম্পাদন, বিদেশ ভ্রমণে প্রাপ্যতার অতিরিক্ত হোটেলভাড়া ও নগদ ভাতা গ্রহণ, চুক্তি করা কাজের পরিমাণ অপেক্ষা অধিক কাজের বিল পরিশোধ, বিদেশে ভ্রমণভাতা বিলে অস্বাভাবিক হারে বিমানভাড়া গ্রহণ, লিজ গ্রহীতার কাছ থেকে বন্দরের ভূমি ব্যবহারজনিত নির্ধারিত ভাড়া অপেক্ষা কম হারে আদায়, বিধিবহির্ভূতভাবে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ২ শতাংশ প্রশাসনিক খরচ প্রদান, বার্থ ও টার্মিনাল অপারেটরের কাছ থেকে স্পেস রেন্ট বাবদ অর্থ আদায় না করা এবং নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার পরও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ইনসেনটিভ বোনাস পরিশোধ ইত্যাদি অনিয়ম রয়েছে। ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল এই তিন অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের আর্থিক কার্যক্রমের নথি পর্যালোচনায় এসব অনিয়ম পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের সর্বশেষ কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্টে নানা অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। সরকারি হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রিপোর্টটি নিয়ে আলোচনাও হয়েছে বলে শুনেছি। এরপর আর কী হলো এ ব্যাপারে আমরা অফিসিয়ালি এখনো কিছুই জানি না।


