জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠনের দেড় বছর পার হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে তারা একটি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেছে। এনসিপিকে নিয়ে জনপরিসরে নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। তবে সব সমালোচনাকে এক কাতারে ফেলে খারিজ করে দেওয়া রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় হবে না।
জামায়াতের সাথে জোট: আদর্শ বনাম কৌশল
নির্বাচনের সময় এনসিপির ওপর প্রধানতম আপত্তির জায়গা ছিল জামায়াতে ইসলামীর সাথে তাদের নির্বাচনী আসন সমঝোতা। মাঠের বাস্তবতা বিবেচনায় এটি ছিল তাদের এক ধরনের কৌশলগত সিদ্ধান্ত। রাজনীতির দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য এবং নির্বাচনের তাৎক্ষণিক ‘রুল অফ প্লে’ (Rule of Play) সবসময় এক পথে চলে না। সেই প্রেক্ষাপটে, বড় দলগুলোর সাথে জোটের সমীকরণ না মেলায় এনসিপির সামনে নিজস্ব সক্ষমতা প্রমাণের তাগিদ ছিল প্রবল।
বিএনপির রাজনৈতিক ঘরানা ও কৌশলগত অবস্থান বিবেচনায় তাদের সাথে এনসিপির আসন ভাগাভাগি না হওয়াটা ছিল স্বাভাবিক। আবার এনসিপির লক্ষ্যও ছিল একটি ‘মেজর পলিটিক্যাল ফোর্স’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা। তাই শুরুর দিকেই অন্য কোনো বড় দলের ছায়াতলে বিলীন না হয়ে, ভোটের অঙ্কে জামায়াতের সাথে আসন সমঝোতা করাকে একটি হিসাববদ্ধ কৌশল হিসেবে দেখা যায়। এটি কোনো আদর্শিক একাত্মতা নয়, বরং একটি দ্বিপাক্ষিক নির্বাচনী সুবিধার সমীকরণ ছিল।
নির্বাচনোত্তর অস্পষ্টতা: উত্তরণের প্রয়োজনীয়তা
নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে চার মাস আগে। এনসিপির পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, তাদের সাথে জামায়াতের সম্পর্কটি কেবলই আসনকেন্দ্রিক এবং সাময়িক। কিন্তু নির্বাচন পরবর্তী এই দীর্ঘ সময়েও জামায়াতের সাথে সম্পর্ক বা অবস্থান নিয়ে দলের ‘ডিফেন্সিভ’ (আত্মরক্ষামূলক) বা অস্পষ্ট অবস্থান সচেতন মহলে প্রশ্ন তৈরি করেছে। একটি রাজনৈতিক দলের দীর্ঘমেয়াদী গ্রহণযোগ্যতার জন্য এ ধরনের অস্পষ্টতা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।
আইডেন্টিটি ক্রাইসিস: এনসিপির রাজনৈতিক পরিচয়
দল গঠনের দেড় বছর পর, এনসিপি ঠিক কোন রাজনৈতিক আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করে—সেন্ট্রিস্ট, সেন্টার-রাইট, নাকি অন্য কোনো ধারা—তা নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি রয়েছে। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে নানা ঘরানার মানুষের সমন্বয়ে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান স্বাভাবিক। কিন্তু একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল হিসেবে দীর্ঘমেয়াদী রাজনীতি করতে হলে একটি সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট আদর্শিক কাঠামো থাকা অপরিহার্য। আইডেন্টিটি ক্রাইসিস বা পরিচয়ের সংকট দীর্ঘায়িত হওয়া রাজনৈতিক অপেশাদারিত্বের ইঙ্গিত দেয়।
এই অস্পষ্টতার কারণে দলটি মাঝেমধ্যেই ‘ডিলেমা’ বা দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ছে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের নীতি বা অন্য দলের কর্মকাণ্ডকে ডিফেন্ড করার বিষয়টি দলের নিজস্ব স্বকীয়তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। অন্য যেকোনো রাজনৈতিক শক্তির ঢাল হিসেবে কাজ করা দলের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য পূরণের পথে বাধা হতে পারে।
সংকট ও আগামীর পথচলা
আগামী চার বছর এনসিপির জন্য নিজেদের ‘মেজর পলিটিক্যাল ফোর্স’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার মোক্ষম সময়। যদি তারা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দলের নিজস্ব আদর্শ পরিষ্কার করতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে টিকে থাকার জন্য তাদের আবারও অন্যের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। সেটি দলের আত্মমর্যাদার জন্য সুখকর হবে না। তারা যদি এই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে না পারে, তবে দলটি দেশের অন্যান্য ক্ষয়িষ্ণু রাজনৈতিক শক্তির মতো নিজস্ব মেরুদণ্ডহীন কোনো দলে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
এনসিপির সম্ভাবনা এখনো উজ্জ্বল; তাদের ছায়াসংসদ বা ছায়াবাজেটের মতো উদ্যোগগুলো তার প্রমাণ। তবে এখন সময় এসেছে পপুলিজমের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রনায়কোচিত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করার। দলের নীতিনির্ধারকদের অভ্যন্তরীণ বিভ্রান্তি ও মতভেদ দূর করে একটি সুনির্দিষ্ট আদর্শিক ভিত্তি তৈরি করতে হবে। নিজস্ব শক্তিতে ও স্পষ্ট রাজনৈতিক দর্শনে রাজপথে নামতে পারলেই কেবল তারা জনগণের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠতে পারবে। অন্যথায়, বাংলাদেশ যে একটি নতুন শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তির অপেক্ষায় আছে, সেই ঐতিহাসিক সুযোগটি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার শঙ্কা থেকেই যায়।
লেখকঃ ডাঃ অমিয় আহসান, সার্জন, এনএইচএস, ইউকে


