খুলনা শহরের নাগরিক জীবনের প্রতিটি পরতে আজ লেগেছে উন্নয়নের নামে ‘দুর্ভোগের’ আঁচ। শহরের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি—সবখানেই যেন উন্নয়নের পরিবর্তে জাঁকিয়ে বসেছে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা। রাস্তা সংস্কারের নামে খোঁড়াখুঁড়ি, বছরের পর বছর ধরে অসম্পূর্ণ প্রকল্প এবং বিভিন্ন সেবাদানকারী সংস্থার মধ্যে চরম সমন্বয়হীনতা খুলনার বাসিন্দাদের জীবনকে করে তুলেছে দুর্বিষহ।
নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সুয়ারেজ প্রকল্পের পাইপলাইন বসানোর পর অনেক রাস্তা আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়নি। কোথাও ইট উঠে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে, কোথাও আবার শুকনো মৌসুমে উড়ছে ধুলাবালি, আর সামান্য বৃষ্টিতেই তা পরিণত হচ্ছে কাদামাটিতে। এই বেহাল দশা কেবল যাতায়াতের ভোগান্তিই বাড়াচ্ছে না, বরং রিকশা, ইজিবাইক ও জরুরি রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স চলাচলেও তৈরি করছে বড় ধরনের বাধা।
অথচ এই প্রকল্পগুলোর উদ্দেশ্য ছিল নাগরিক সেবা বৃদ্ধি করা। দুর্ভাগ্যজনক হলো, দীর্ঘ ১৩ বছর পার হয়ে গেলেও অনেক প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলো সংশোধন আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বছরের পর বছর ঝুলে থাকায় এলাকার লক্ষাধিক মানুষ আজ দিশেহারা। একইভাবে, ঠিকাদারের অবহেলা, নিম্নমানের কাজ এবং বিল তুলে নিয়ে কাজ বন্ধ করে রাখার মতো ঘটনাগুলো যেন খুলনার অবকাঠামো উন্নয়নের এক সাধারণ চিত্রে পরিণত হয়েছে।
খুলনার নিরালা ১ নং সড়টি এই এলাকার মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শহরের গণ্যমান্য ব্যাক্তিদের আবাসস্থল নিরালা। কিন্তু উন্নয়নের মহাসড়কে এসে হারিয়ে গেছে নিরালার রাস্তা উন্নয়নের গাড়ির চাবি। এ রকম অবস্থা খুলনার অনেক অলিগলির ও মূল রাস্তার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনা করার সময় বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতাই এই বিপত্তির মূল কারণ। সিটি করপোরেশন, সড়ক ও জনপদ বিভাগ এবং খুলনার ওয়াসার খামখেয়ালিপনায় একদিকে যেমন অর্থ অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে নাগরিকরা প্রতিদিন খেসারত দিচ্ছেন তাদের কর্মঘণ্টা হারিয়ে। এছাড়া মোংলা-খুলনা মহাসড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সংস্কারের অভাবে পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে।
উন্নয়ন কোনো বিলাসিতা নয়, এটি নাগরিকের অধিকার। দায়সারা কাজ বা অপরিকল্পিত খননকাজ চালিয়ে নগরবাসীকে বছরের পর বছর জিম্মি করে রাখা অগ্রহণযোগ্য। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে প্রকল্পগুলোর কাজের গতি বাড়াতে হবে এবং ঠিকাদারদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত না করা পর্যন্ত খুলনার এই ‘উন্নয়ন দুর্ভোগ’ থেকে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
শহরের ধমনীগুলো আজ ক্ষতবিক্ষত। সময় এসেছে উন্নয়নের নামে এই প্রহসন বন্ধ করে প্রতিটি কাজ স্বচ্ছতা ও গুণগত মান বজায় রেখে দ্রুত সম্পন্ন করার। খুলনার নাগরিকরা কেবল প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না, তারা চায় স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচলের একটি সুন্দর নগরী।
লেখক: আলি আবরার, সাংবাদিক


