দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র খুলনা আজ কেবল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের প্রভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকির এক নতুন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর বর্ষাকালে সারা দেশের সাথে খুলনাবাসীকেও ডেঙ্গুর ভয়াবহ আতঙ্কের মুখোমুখি হতে হয়। খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) এলাকা এবং এর আশপাশের উপজেলাগুলোতে এডিস মশার উপদ্রব যেভাবে বাড়ছে, তাতে কেবল সরকারি বা সিটি করপোরেশনের একক প্রচেষ্টার ওপর ভরসা করে বসে থাকার সময় আর নেই। ডেঙ্গুর এই অদৃশ্য আগ্রাসন রুখতে প্রয়োজন খুলনার সকল স্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং একটি সমন্বিত নাগরিক উদ্যোগ।
১. খুলনার বর্তমান প্রেক্ষাপট ও বাস্তব চিত্র
খুলনা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় অপরিকল্পিত ও দ্রুতগতির আবাসন নির্মাণ কাজের কারণে এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। নির্মাণাধীন ভবনের বেজমেন্টে বা জমিয়ে রাখা পানিতে অবাধে বংশবিস্তার করছে এডিস মশা। তাছাড়া বিভিন্ন ভাঙ্গাচোরা রাস্তায়, ওয়াসার কেটে রেখে আশা রাস্তার ভাঙ্গনে ও বিভিন্ন ড্রেনে জন্ম নিচ্ছে মশার লার্ভা। এছাড়া খুলনাঞ্চলের লবণাক্ততা ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বর্ষার স্থায়িত্ব ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার ত্রুটি জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে, যা মশার প্রজননকে আরও ত্বরান্বিত করে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর উপচে পড়া ভিড় প্রতিবছর আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে।
২. কেন প্রয়োজন সমন্বিত নাগরিক হস্তক্ষেপ?
মশক নিধনে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নিয়মিত ফগার মেশিন দিয়ে ওষুধ ছিটানো এবং লার্ভিসাইড প্রয়োগের কথা বলা হলেও, বাস্তবে তা অনেক সময় অপ্রতুল প্রমাণিত হয়। এর মূল কারণ হলো—এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে, যা আমাদের বাড়ির ভেতরে বা আশপাশে সুপ্ত অবস্থায় থাকে।
- ঘরের ভেতর ও ছাদবাগান: ফ্রিজের তলা, এসি বা কুলারের ট্রে, অব্যবহৃত পাত্র এবং ছাদবাগানের ড্রামে জমে থাকা পরিষ্কার পানি মশার নিরাপদ আঁতুড়ঘর।
- নাগরিক সচেতনতার ঘাটতি: অনেক সময় সচেতনতার অভাবে নাগরিকরা নিজেদের আঙিনা পরিষ্কার রাখতে উদাসীন থাকেন।
তাই সিটি করপোরেশন একা নয়, বরং প্রতিটি পরিবার, আবাসিক এলাকা, এবং ব্যবসায়ী সংগঠনকে একযোগে মাঠে নামতে হবে।
৩. খুলনায় ডেঙ্গু মোকাবেলায় কার্যকর কর্মপন্থা
খুলনাতে ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে নিম্নোক্ত সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপে জোর দেওয়া জরুরি:
- ওয়ার্ডভিত্তিক সচেতনতা কমিটি গঠন: খুলনার প্রতিটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলরদের নেতৃত্বে যুবসমাজ, স্কাউট ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সমন্বয়ে ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধ কমিটি’ গঠন করা।
- নিয়মিত লার্ভা ধ্বংস অভিযান: সপ্তাহে অন্তত একদিন ‘লার্ভা নিধন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা দিবস’ পালন করে বাড়ির চারপাশ ও ফুলের টব পরিষ্কার করা।
- শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে নজরদারি: স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি-বেসরকারি অফিসগুলোর চারপাশ নিয়মিত পরিষ্কার রাখা এবং শিক্ষার্থীদের ডেঙ্গু সুরক্ষায় অভ্যস্ত করা।
- চিকিৎসা সেবার বিকেন্দ্রীকরণ: ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী স্থানীয় ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত পরিমাণে নিশ্চিত করা, যাতে সাধারণ মানুষ সহজে সেবা পায়।
৪. সম্মিলিত পদক্ষেপই পারে সুরক্ষা দিতে
ডেঙ্গু প্রতিরোধ কেবল একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের নৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। খুলনার সুন্দর পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় প্রয়োজন নাগরিক সমাজ, প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং গণমাধ্যমের সম্মিলিত প্রয়াস। আসুন, ঘরের কোণ থেকে শুরু করে পুরো খুলনা শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখার শপথ নিই। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন ও দায়িত্বশীল হই, তবেই একটি নিরাপদ ও ডেঙ্গুমুক্ত খুলনা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।


