দেশের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে স্বাগত জানালেও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আরও সুস্পষ্ট ও অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মত প্রকাশ করেছেন খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক তিনবারের পরিচালক কাজী হাফিজুর রহমান। তাঁর মতে, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলা, ভোমার ও বেনাপোল স্থাল বন্দর, খুলনা ও নোয়াপাড়া নদী বন্দর, সুন্দরবন, চিংড়ি শিল্প, কৃষি ও পর্যটনকে কেন্দ্র করে খুলনা একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক হাবে পরিণত হওয়ার সক্ষমতা রাখে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে বাজেটে বিশেষ উদ্যোগের প্রতিফলন আরও স্পষ্ট হওয়া উচিত ছিল।
বাজেট-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, জাতীয় অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার এবং প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকার যে বড় আকারের বাজেট দিয়েছে, তা ইতিবাচক। তবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়নের বাইরে এসে অঞ্চলভিত্তিক শিল্পায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। সেই বিবেচনায় খুলনার জন্য একটি পৃথক অর্থনৈতিক উন্নয়ন কৌশল অত্যন্ত জরুরি।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে। বাজেটে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে উন্নয়ন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর ঘোষণা এসেছে।
এই প্রসঙ্গে কাজী হাফিজুর রহমান বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এই লক্ষ্য অর্জনে শিল্প ও বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। আর শিল্পায়নের ক্ষেত্রে খুলনা অঞ্চল দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় এলাকা। এই অঞ্চলে মোংলা সমুদ্র বন্দর, সাতক্ষীরার ভোমরা স্থল বন্দর, বেনাপোল স্থল বন্দর, নোয়াপাড়া নদী বন্দর, খুলনা নদী বন্দর, পদ্মা সেতু, খুলনা-মোংলা রেলপথ এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ইতোমধ্যে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এখন প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট নীতিগত সহায়তা।
তিনি দাবি করেন, খুলনাকে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইকোনমিক জোন) হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করা উচিত। তাঁর ভাষায়, খুলনাকে যদি সত্যিকার অর্থে একটি ইকোনমিক জোন হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে শুধু খুলনা নয়, পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির চিত্র বদলে যাবে। এতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে, রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে উঠবে এবং লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। ফলে আঞ্চলিক বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। অথচ খুলনা এমন একটি অঞ্চল, যেখানে সমুদ্রবন্দর, আন্তর্জাতিক নৌপথ, কৃষি, মৎস্য, পর্যটন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বহু খাতের বিকাশের সুযোগ রয়েছে।
মোংলা বন্দরের সাম্প্রতিক অগ্রগতির প্রসঙ্গ টেনে কাজী হাফিজুর রহমান বলেন, মোংলা বন্দর এখন আর সম্ভাবনার বন্দর নয়, এটি বাস্তব সাফল্যের বন্দর। গত কয়েক বছরে বন্দরের কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই গতি ধরে রাখতে হলে বন্দরকেন্দ্রিক শিল্পায়নে বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসেই বন্দরে ২১ হাজার ৬৫১ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা আগের পুরো অর্থবছরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংকেও ছাড়িয়ে গেছে। একই সময়ে ৫১৫টি বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ বন্দরে নোঙর করেছে এবং কার্গো হ্যান্ডলিং বেড়েছে ২৫ শতাংশেরও বেশি।
তিনি বলেন, এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে মোংলা বন্দরকে ঘিরে শিল্প বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন যদি সরকার কর অবকাশ, সহজ শর্তে ঋণ, অবকাঠামোগত সুবিধা এবং গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করে, তাহলে মোংলাকে কেন্দ্র করে বড় শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা সম্ভব।
চিংড়ি শিল্পের বিষয়েও বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তাঁর মতে, দেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হওয়া সত্ত্বেও চিংড়ি শিল্প এখনও নানা সংকটে রয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা এবং মান নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উদ্যোক্তাদের সহায়তা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, খুলনার অর্থনীতির সঙ্গে চিংড়ি শিল্প ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই খাতকে টিকিয়ে রাখতে এবং রপ্তানি বাড়াতে বিশেষ প্রণোদনা, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা, আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার এবং গবেষণাভিত্তিক সহায়তা জরুরি। বাজেটে এ খাতের জন্য আরও স্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকলে ভালো হতো।
পর্যটন খাতের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুন্দরবনকে ঘিরে পরিবেশবান্ধব পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটানো গেলে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ও বাড়বে। তাই বাজেটে এই পর্যটন বাড়াতে বিশেষ বরাদ্ধ রাখা হোক।
কাজী হাফিজুর রহমান মনে করেন, শুধু বড় শিল্প নয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্যও বাজেটে আরও বাস্তবধর্মী উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি বলেন, এসএমই খাতই বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। কিন্তু অনেক উদ্যোক্তা এখনও সহজ শর্তে ঋণ পান না। ব্যাংক ঋণের জটিলতা, উচ্চ সুদের হার এবং জামানত সংকট ব্যবসা সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করছে। এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
তিনি আরও বলেন, খুলনা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা অন্যতম অঞ্চল। লবণাক্ততা, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা এবং ঘূর্ণিঝড়ের কারণে এখানকার অর্থনীতি নিয়মিত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই উপকূলীয় অঞ্চলের শিল্প ও ব্যবসা সুরক্ষায় বিশেষ জলবায়ু তহবিল গঠন এবং অভিযোজন প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা এমন একটি বাজেট বাস্তবায়ন দেখতে চাই, যা শুধু রাজস্ব আদায়ের হিসাব নয়, বরং বিনিয়োগ সৃষ্টি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার পথ দেখাবে। খুলনার জন্য আলাদা অর্থনৈতিক রোডম্যাপ প্রণয়ন করা গেলে এটি আগামী দশকে দেশের অন্যতম প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিনে পরিণত হতে পারে।
তিনি বলেন, আজকের বিশ্বে যে অঞ্চলগুলো বন্দর, যোগাযোগ ও শিল্পকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে পেরেছে, তারাই দ্রুত এগিয়েছে। খুলনার ক্ষেত্রেও সেই সুযোগ রয়েছে। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন।
সবশেষে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সরকার যদি খুলনাকে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়, তাহলে এই অঞ্চল শুধু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নয়, পুরো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
কাজী হাফিজুর রহমান, সাবেক তিনবারের পরিচালক, খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি


